আমাদের বাঁশখালী Our Banshkhali
-
October 22, 2022
বাঁশখালী বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী একটি উপজেলা।
বাঁশখালী উপজেলার আয়তন ৩৭৬.৯০ বর্গ কিলোমিটার (৯৩,১৩৫ একর)।[১] চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণে[২] ২১°৫৩´ থেকে ২২°১১´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১°৫১´ থেকে ৯২°০৩´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ জুড়ে বাঁশখালী উপজেলার অবস্থান। এ উপজেলার উত্তরে সাঙ্গু নদী ও আনোয়ারা উপজেলা, পূর্বে সাতকানিয়া উপজেলা ও লোহাগাড়া উপজেলা, দক্ষিণে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলা ও পেকুয়া উপজেলা এবং পশ্চিমে কুতুবদিয়া চ্যানেল, কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপজেলা ও বঙ্গোপসাগর অবস্থিত।[৩]
বাঁশখালী থানা গঠিত হয় ১৯১৭ সালের ১৫ জুলাই[৪] এবং থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৮৩ সালে।[৩] এ উপজেলায় ১টি পৌরসভা ও ১৪ টি ইউনিয়ন রয়েছে। সম্পূর্ণ বাঁশখালী উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম বাঁশখালী থানার আওতাধীন।
- পৌরসভা:
- ইউনিয়নসমূহ:[৫]
১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা
বাঁশখালী নামের ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে প্রামাণ্য কোন তথ্য পাওয়া যায়না, এই নামের উৎপত্তি কবে হয় তা সঠিক ভাবে জানার শত চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি, নানা মুনির নানা মত হওয়ায় যুক্তি থাকা স্বত্ত্বেও তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এ ক্ষেত্রে বাঁশখালীর প্রবাদ পুরুষ বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম প্রণীত “বাঁশখালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য” গ্রন্থে চারটি কিংবদন্তির উল্লেখ আছে।[৬] তথ্যগত দিক দিয়ে তার বর্ণিত কিংবদন্তিগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কিংবদন্তি-১: বাঁশখালী পাহাড়ের পূর্বে সাতকানিয়া উপজেলা অবস্থিত। কথিত আছে যে, ঐ এলাকায় ২ ভাই ১ বোনের এক পরিবার ছিল। বোনটির বিয়ে হয় পশ্চিমে অর্থাৎ বাঁশখালীতে, সে সেখানে স্বামীসহ জমি আবাদ করে বাস করতে থাকে। পরবর্তীতে পৈত্রিক সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ভাই বোন বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। বিবাদের এক পর্যায়ে বোনের পক্ষে মারামারিতে প্রচুর বাঁশ ব্যবহার করা হয়। এক পর্যায়ে বাঁশ ঝাড়ে আর কোন বাঁশ অবশিষ্ট না থাকায় বোনের পক্ষের লোকেরা বলতে থাকে বাঁশ সব শেষ করে দিল অর্থাৎ বাঁশ কেটে খালী করে দিয়েছে। এইভাবে বাঁশ খালী বলতে বলতে বাঁশখালী নামের উৎপত্তি।
কিংবদন্তি-২: কথিত আছে যে, বাঁশখালী এলাকায় প্রথম জরিপ চলাকালে এক জায়গায় একটি বাঁশ খুঁটি স্বরূপ পুঁতে রাখা হয়। ঐ বাঁশ দূর থেকে দেখা যাওয়ার জন্য খুঁটির ডগায় একটি কাক মেরে বেঁধে দেয়া হয়। পরবর্তীতে কাকটিকে খুঁটির ডগায় আর দেখা যায়নি। তখন একে অপরকে বাঁশ খালী বলে জানায়। এভাবে বাঁশখালী নামের উৎপত্তি বলে ধরে নেয়া হয়।
কিংবদন্তি-৩: বাঁশখালীতে সোনাইছড়ি (হোনাইছড়ি) নামে একটি খাল আছে। পার্শ্ববর্তী চকরিয়া উপজেলা থেকে ব্যবসায়ীরা বাঁশ ক্রয় করে সোনাইছড়ি খালে জমা করত। পুরাখাল বাঁশের ভেলায় ভর্তি হয়ে যেত। তারপর অন্যান্য খালে নিয়ে যেত। এর থেকেই নাম হলো বাঁশখালী।
কিংবদন্তি-৪: সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়ায় সাঙ্গু নদীর তীরে মরহুম মৌলানা শরফ-উদ-দীন বেহাল (রহ.)-এর মাজার দৃষ্ট হয়। জনশ্রুতি মতে ঐ বেহাল সাহেব মযযুব ছিলেন। আরও শোনা যায় জোর করে তিনি মগ মহিলাদের দুধ পান করতেন এতে মগেরা বিরক্ত হয়ে মস্তক কেটে তাকে হত্যা করলে দেখা যায় বার বার তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। তখন মগেরা তার ছিন্ন মস্তকটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে আসে। অনেক দিন পরে সমুদ্র বক্ষ থেকে জেলেরা ঐ মস্তক উদ্ধার করে এবং আশ্চর্য হয় দেখে যে, মস্তকটি এখনও তাজা। ছিন্ন মস্তকটির দেহের খোঁজ নেয়ার উদ্দেশ্যে একটি বাশেঁর উপর ডগায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। অপরদিকে মুণ্ডু বিহীন দেহটি বেশ কয়েকদিন তরতাজা থাকায় বাজালিয়া বাসী কিছু মুসলমান ও কিছু মগও খণ্ডিত মস্তকটির খোঁজে সমুদ্র উপকূলে আসে। মস্তকটির খোঁজ পেলে দুই পক্ষই দেহটি (মস্তক ও দেহ) রেখে দিতে চায়। শেষ পর্যন্ত ফয়সালা হল পরের দিন শিরটি যদি সকাল পর্যন্ত বাঁশের ডগায় থাকে তবে শির সহ দেহটিকে সমুদ্র উপকূলে দাফন করতে হবে আর যদি বাঁশের ডগা থেকে শিরটি পড়ে যায় তবে দেহটি বাজালিয়ায় দাফন করা হবে। পরদিন সকালে যথারীতি দেখা যায়শিরটি মাটিতে পড়ে আছে। উল্লেখ্য উভয় পক্ষের লোক সারারাত পাহারায় ছিল তাদের অলক্ষ্যে কখন যে শিরটি মাটিতে ছিটকে পড়ল তারা বুঝতে পারেনি। সবাই বলতে লাগল বাঁশ তো খালী। পরে দেহটি বাজালিয়ায় দাফন করা হয়। সাতকানিয়ায় বেহাল সাহেবের মাজার অত্যন্ত সম্মানিত। যাত্রীবাহী গাড়ী মাজার অতিক্রমকালে যাত্রি নামিয়ে দেয়। সেই ছিন্ন মস্তক ছিটকে পড়ার পর থেকে অর্থাৎ বাঁশটি খালী হয়ে যায় । এভাবে বাঁশখালী নামের গোড়াপত্তন হয়।
পরিশেষে বলতে হয় ড. আবদুল করিমের আলোচিত শেষেক্তো বর্ণনাটি সর্বাধিক প্রচলিত। তার মতে দ্বিতীয় কিংবদন্তির যৌক্তিকতা থাকতে পারে, তবে এতে যে জরিপটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা যদি ইংরেজ আমলে হয়ে থাকে তবে তা ইংরেজ আমলের আগেই বাঁশখালীর নামকরণ করা হয়ে থাকবে। তাই কিংবদন্তিটি সত্য হতে পারেনা। প্রথম কিংবদন্তিটি যেহেতু বাঁশ কেটে খালী করার সাথে সম্পৃক্ত তাই এটি সত্য কিংবা সত্য নাই হউক না কেন এতে ধরে নেয়া যায় যে, বাঁশ এবং খালী দুই শব্দের সহমিলনে বাঁশখালী নামটি গঠিত।[৩]
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাঁশখালী উপজেলার মোট জনসংখ্যা ৪,৩১,১৬২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২,১২,৬৯৭ জন এবং মহিলা ২,১৯,১৫১ জন। মোট পরিবার ৮৪,২১৬টি।[১] মোট জনসংখ্যার ৮৮% মুসলিম, ১১% হিন্দু এবং ১% বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।[৩]
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাঁশখালী উপজেলার সাক্ষরতার হার ৩৭.৪%।[১] এ উপজেলায় ৩টি ডিগ্রী কলেজ, ৭টি ফাজিল মাদ্রাসা, ২টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ, ১টি কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৪টি আলিম মাদ্রাসা, ২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৪টি দাখিল মাদ্রাসা ও ১৬১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।[২]এ ছাড়া আরো অনেক কওমি মাদ্রাসা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য এবং অন্যতম হলো (১) বাঁশখালী চাম্বল মাদ্রাসা (২) এবং বাঁশখালীর প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ মখযনুল উলূম মাদরাসা।
- উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
বাঁশখালী উপজেলার অধিকাংশ লোক কৃষিজীবী। এছাড়া অনেকে বিভিন্ন চাকরি, ব্যবসা বা অন্যান্য পেশার সাথেও জড়িত এবং অত্র উপজেলাধীন কালীপুরের লিচু দেশের সেরা ও বিখ্যাত হিসাবে পরিচিত রয়েছে।
- প্রধান কৃষি ফসল
পান, ধান, চা, আলু, আদা, শাকসবজি।
- প্রধান ফল-ফলাদি
আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, পেঁপে, তরমুজ, লেবু, পেয়ারা।
- প্রধান রপ্তানিদ্রব্য
পান লিচু, চা, আদা, চিংড়ি,ইলিশ ও আরও অনেক সামুদ্রিক মাছ।[৩]
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম জীবনীশক্তি হলো ব্যাংক এবং এই ব্যাংকগুলো দেশের মুদ্রাবাজারকে রাখে গতিশীল ও বৈদেশিক বাণিজ্যকে করে পরিশীলিত। বাঁশখালী উপজেলায় অবস্থিত ব্যাংকসমূহের তালিকা নিচে উল্লেখ করা হলো:
| ক্রম নং | ব্যাংকের ধরন | ব্যাংকের নাম | শাখা | ব্যাংকিং পদ্ধতি | ঠিকানা |
|---|
| ০১ | রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংক | অগ্রণী ব্যাংক | গুনাগরী শাখা[৭] | সাধারণ | গুনাগরী, বাঁশখালী |
| ০২ | সোনালী ব্যাংক | খানবাহাদুর বাজার শাখা[৮] | বৈলছড়ি, বাঁশখালী |
| ০৩ | বাঁশখালী শাখা[৯] | বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ০৪ | বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক | আইএফআইসি ব্যাংক | জলদী উপশাখা[১০] | সাধারণ | আনোয়ারা বাঁশখালী সড়ক, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ০৫ | এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক | বাঁশখালী রেজিঃ উপশাখা[১১] | বাঁশখালী ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিস, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ০৬ | আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক | চাম্বল শাখা[১২] | ইসলামী শরিয়াহ্ ভিত্তিক | গ্রীন সোহেল কমপ্লেক্স, চাম্বল বাজার, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ০৭ | ইউনিয়ন ব্যাংক | চাম্বল শাখা[১৩] | মান্নান সেন্টার (২য় তলা), চাম্বল বাজার, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ০৮ | বাঁশখালী চাঁদপুর শাখা[১৪] | মোহাম্মদিয়া শপিং সেন্টার (১ম তলা), চাঁদপুর বাজার, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ০৯ | গুনাগরী উপশাখা[১৫] | সাহেব মিয়া সিটি সেন্টার (১ম তলা), গুনাগরী খাসমহল বাজার, কালীপুর, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ১০ | জলদী উপশাখা[১৬] | টাওয়ার (১ম তলা), বাঁশখালী মেইন রোড, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ১১ | পুঁইছড়ি উপশাখা[১৭] | রিয়াদ মার্কেট (১ম তলা), ডিবি রোড, পুঁইছড়ি, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ১২ | ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ | বাঁশখালী শাখা[১৮] | শেখ টাওয়ার, জলদী, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ১৩ | গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক | চাম্বল শাখা[১৯] | গ্রীন সোহেল কমপ্লেক্স, পূর্ব চাম্বল, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ১৪ | কালীপুর উপশাখা[২০] | রজনীগন্ধা কমিউনিটি সেন্টার (সাব রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে), বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ১৫ | ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক | বাঁশখালী শাখা[২১] | হাজী রওশন মঞ্জিল, উত্তর জলদী, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
| ১৬ | গুনাগরী উপশাখা[২২] | আল আমিন শপিং সেন্টার, রামদাস মুন্সিরহাট, গুনাগরী, কালীপুর, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম |
বাঁশখালী উপজেলায় যোগাযোগের প্রধান সড়ক চট্টগ্রাম-বাঁশখালী সড়ক। সব ধরনের যানবাহনে যোগাযোগ করা যায়। এছাড়া উপজেলার অভ্যন্তরে ১৭৩ কিলোমিটার পাকারাস্তা, ৪৭ কিলোমিটার আধা-পাকারাস্তা ও ৭১২ কিলোমিটার কাঁচারাস্তা রয়েছে।[৩]
বাঁশখালী উপজেলায় ১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৩টি পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র ও ৩টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে।[৩]
বাঁশখালী উপজেলায় ৪৬৪টি মসজিদ, ৫২টি মন্দির, ৬টি বিহার ও ১টি গীর্জা রয়েছে।[৩]
বাঁশখালী উপজেলার উত্তর সীমান্ত দিয়ে বয়ে চলেছে সাঙ্গু নদী। এছাড়া এ উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে জলকদর খাল।[২৩]
বাঁশখালী উপজেলায় মোট হাটবাজার ৪৪টি এবং ৬টি বাৎসরিক মেলা বসে।[৩]
- উল্লেখযোগ্য হাটবাজার[২৪]
- উল্লেখযোগ্য মেলা[৩]
১৯৭১ সালের ১৯ মে পাকবাহিনী ৭৫ জন নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাছাড়া তারা জলদী, বাণীগ্রাম ও কালীপুরে অসংখ্য ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং অক্টোবর মাসে পাকবাহিনী বাঁশখালীর দক্ষিণ প্রান্তে নাপোড়া গ্রামে ৮৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। পাকবাহিনী বাঁশখালীর পূর্ব প্রান্তে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং বৈলছড়িতে মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ফরহাদ চৌধুরী, সুজন কান্তি দাশ, ফ্লাইট সার্জেন্ট মহিউল আলম, আবু সাঈদ ও মোহাম্মদ ইলিয়াস চৌধুরীকে হত্যা করে।[৩]
- মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন[৩]
বাঁশখালী উপজেলার প্রখ্যাত ব্যক্তিগণের মধ্যে রয়েছেন:
বাঁশখালী প্রেসক্লাব, থানার সামনে বেসরকারি ভুবন একটি।
- সংসদীয় আসন
- উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসন
উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা: সাইদুজ্জামান চৌধুরী।
0 Comments